মানুষ প্রয়োজনেই নতুন নতুন আবিষ্কার করে। সভ্যতার ঊষালগ্নে মানুষ শুকনো দু’খণ্ড কাঠ ঘর্ষণ করে আগুনের প্রয়োজন মেটাতো। এরপর তারা চকমকি পাথর পেলো, যার সাহায্যে আগুন জ্বালানো আরো সহজ হয়ে ওঠে। তবে চকমকি পাথর খুব সহজপ্রাপ্য ছিলো না বলে যাদের কাছে এটি ছিলো তারা একে অত্যন্ত পবিত্রতার সাথে ব্যবহার করতো এবং তারা এটাকে দেবতার দান বলে মনে করতো। কিন্তু এর দুষ্প্রাপ্যতার কারণে সহজে ও নিরাপদে আগুন জ্বালানোর ব্যাপারে মানুষের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকে। দীর্ঘকাল চেষ্টার পর ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে জার্মান রসায়নবিদ হেনিগ ব্রান্ড ফসফরাস আবিষ্কার করেন এবং আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহার করেন। কিন্তু এ পদার্থটি এত দামি ও সহজ দাহ্য ছিলো না, এর ব্যবহার মোটেই নিরাপদ ছিলো না। ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে হাউক উইৎস নামে এক বিজ্ঞানী ছোট ছোট সরু কাঠ শুকিয়ে এর অগ্রভাগে গন্ধকের প্রলেপ দিয়ে তার ওপর চকমকি পাথর ঠুকে খুব সহজেই আগুন জ্বালানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এ পদ্ধতি আগের তুলনায় অনেক নিরাপদ ছিলো বলে হাউককে আধুনিক ম্যাচ আবিষ্কারের পথিকৃৎ বলা চলে।
এভাবে বহুকাল কাটানোর পর অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে শ্বেত ফসফরাস আবিষ্কার হয়। মোমে ডোবানো কাঠের সরু শুকনো কাঠির মাথায় এ পদার্থ লাগিয়ে কাচের পাত্রে রাখা হত এবং এ কাচপাত্র ভেঙে আগুন জ্বালানো সম্ভব হত। এতে চকমকি পাথর লাগতো না বটে, তবে মোটেই নিরাপদ ছিলো না।
১৮২৭-এ একজন ইংরেজ ওষুধ বিক্রেতা জন ওয়াকার নানারূপ রাসায়নিক পদার্থ কাঠির মাথায় আঠার সাহায্যে লাগিয়ে নিয়ে শুকিয়ে অমসৃণ জায়গায় ২/৪ বার ঘষেই পেয়ে গেলেন আগুন, যা আসলেই সেফটি ম্যাচের প্রথম পর্যায় বলা চলে। ২/৩ বছর এভাবেই চলল, যদিও এভাবে কোন কোন সময় কাঠি ভেঙে যেতো বা আদৌ জ্বলত না।
১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের চার্লস সৌরিয়া ওয়াকারের ম্যাচের কাঠিতে অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থের সাথে শ্বেত ফসফরাস লাগিয়ে এ ব্যবহারে অনেক উন্নতি সাধন করলেন। এ পদ্ধতিতেই ১৮৩৬-এ আমেরিকায় প্রথম সেফ্টি ম্যাচ তৈরি হলো। তবে ফসফরাসের ব্যবহার খুব নিরাপদ ছিলো না; কেননা অক্সিজেন জারিত হলে বা কাঠিতে কাঠিতে মৃদু ঘর্ষণেও আগুন জ্বলে উঠতো; অতএব বিজ্ঞানীরা এতেও খুব সন্তুষ্ট থাকতে পারলেন না। শুরু হলো আরো চিন্তা-ভাবনা। অবশেষে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার একটি ম্যাচ কোম্পানি লাল ফসফরাস ও পটাশিয়াম ক্লোরেটের একট বিষক্রিয়া মুক্ত মিশ্রণ তৈরি করে শুকনো কাঠির ডগায় আঠার সাহায্যে লাঠিয়ে কাঠিগুলো একটি ছোট হালকা কাঠের বাক্সের রাখার ব্যবস্থা করে। ক্ষুদ্র বাক্সের দুই পাশে রেড লেড, সোডিয়াম নাইট্রেট ও মিহি কাচের গুঁড়ার সাহায্যে প্রলেপ দেয়া হলো। এরূপ একটি ম্যাচ বাক্স অপেক্ষাকৃত অনেক নিরাপদ হলো। এরপর কাঠি যাতে অল্প ঘর্ষণেই জ্বলে ওঠে,
প্রয়োজন শেষে ফুঁ দিয়ে নেভানো যায় এবং পুড়ে যাওয়া কাঠি যাতে পড়ে যেতে না পরে তার জন্য আরো গবেষণা চললো। অবশেষে রেড লেড, এন্টিমনি সালফাইড পটাশিয়াম ক্লোরেট, ফসফরাস, সালফাইড ও পটাশিয়াম ডাইক্রোমেট ইত্যাদির মিশ্রণ অ্যামোনিয়াম ফসফেটের দ্রবণে ডুবিয়ে শুকিয়ে নেয়া কাঠির মাথায় শিরিষের লেই দিয় লাগানো হলো। বাক্সের দুই পাশে লাল ফসফরাস, রেড লেড ও মসৃণ বালি প্রভৃতি শিরিষের লেইর সাহায্যে আটকে দেয়া হলো। এ অবস্থায় ম্যাচ সত্যি সত্যিই নিরাপদ হলো এবং পরবর্তীকালে কাঠিগুলো উপরোক্ত পদ্ধতিসহ কার্বোরাইজ করে পুড়ে যাওয়া কাঠি যাতে খসে না পড়ে তার ব্যবস্থা করা হলো।
ম্যাচ দেখতে ছোট আকারের হলেও ব্যবহারের দিক দিয়ে এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে এর ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার।


No comments:
Post a Comment